স্টাফ রির্পোটার :
আজ ১০ই মহররম, পবিত্র আশুরা। হিজরি ১৪৪৭ সালের প্রথম মাস মহররমের দশম দিনটি মুসলিম বিশ্বে একদিকে যেমন শোক ও বেদনাবিধুর, অন্যদিকে তেমনি তা শিক্ষা, আত্মত্যাগ ও মানবতার এক অনন্য আদর্শের দিন।
পবিত্র আশুরা উপলক্ষে ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা দিনটি নফল রোজা, বিশেষ নামাজ, দান-সদকা, কোরআন তিলাওয়াত ও জিকির-আসকারের মাধ্যমে পালন করে থাকেন।
‘আশুরা’ শব্দটি এসেছে আরবি ‘আশারা’ (عَشَرَةٌ) থেকে, যার অর্থ ‘দশ’। আর ‘মহররম’ অর্থ ‘সম্মানিত’। ইসলামী ক্যালেন্ডারের অন্যতম পবিত্র এই মাসে বহু ঐতিহাসিক ঘটনা সংঘটিত হয়েছে।
হিজরি ৬১ সনের ১০ই মহররম পবিত্র কারবালা প্রান্তরে ইতিহাসের এক হৃদয়বিদারক ও চিরস্মরণীয় ঘটনা সংঘটিত হয়। মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর প্রাণপ্রিয় দৌহিত্র হজরত ইমাম হোসেন (রা.) সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে অবস্থান নিয়ে এক জুলুমবিরোধী সংগ্রামে শহীদ হন।
ইয়াজিদের অন্যায়, জুলুম ও স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়ে ইমাম হোসেন (রা.) আল্লাহর রাস্তার ওপর অবিচল থেকে আত্মোৎসর্গ করেন। তাঁর সঙ্গে পরিবারের সদস্য ও অনুসারীসহ ৭২ জন কারবালার প্রান্তরে ফোরাত নদীর তীরে পানির অভাবে এবং শত্রুদের নির্মম আক্রমণে শাহাদাত বরণ করেন।
এই বেদনাবিধুর ঘটনা কেবল ইসলামের ইতিহাসেই নয়, সমগ্র মানবতার ইতিহাসেও এক অনন্য দৃষ্টান্ত। ইমাম হোসেন (রা.)-এর এই আত্মত্যাগ নিপীড়নের বিরুদ্ধে ন্যায়, মানবতা ও সাহসিকতার প্রতীক হয়ে আছে।
পবিত্র আশুরা দিনটি কেবল শোক ও বেদনার নয়, বরং এটি আত্মসংযম, ত্যাগ ও ন্যায়ের পক্ষে অবস্থানের শিক্ষা দেয়। ইসলাম যে শান্তি, ন্যায়বিচার ও মানবকল্যাণের ধর্ম—এ দিনের ঘটনাবলি তারই জীবন্ত দলিল।
পবিত্র আশুরা অন্যায়, জুলুম ও স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর হিসেবে যুগে যুগে মুসলমানসহ সমগ্র মানবজাতিকে অনুপ্রেরণা জোগায়। এই দিন আমাদের মনে করিয়ে দেয়, সত্য প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজনে আত্মত্যাগ করতেও পিছপা হওয়া যাবে না।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এবং বাংলাদেশেও শিয়া সম্প্রদায় আশুরা উপলক্ষে শোকানুষ্ঠান, মাতম ও তাজিয়া মিছিল আয়োজন করে থাকে। রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন শহরে তাজিয়া মিছিলের নিরাপত্তা ও সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনায় প্রশাসন প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে।
হাদিস শরিফ অনুযায়ী, আশুরার দিনে রোজা রাখা অতীব ফজিলতপূর্ণ। হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) আশুরার রোজা রাখতেন এবং সাহাবায়ে কেরামকেও তা পালনের উৎসাহ দিতেন। বুখারি ও মুসলিম শরিফে বর্ণিত আছে, আশুরার রোজা এক বছর পূর্বের গুনাহ মোচনের উপায়।
তবে ইহুদি সম্প্রদায়ও এদিন রোজা রাখত বলে, রাসুল (সা.) আশুরার সঙ্গে মিলিয়ে ৯ ও ১০ অথবা ১০ ও ১১ মহররম রোজা রাখতে উৎসাহ দিয়েছেন, যাতে মুসলিম রোজা ইহুদি রীতির সঙ্গে মিলে না যায়।
পবিত্র আশুরা আমাদের কাছে কেবল ইতিহাসের একটি দিন নয় এটি নৈতিকতা, আত্মত্যাগ, সত্য ও ন্যায়ের সংগ্রামের প্রতীক। কারবালার এই মহাকাব্যিক আত্মত্যাগ মুসলমানদের ঈমান ও চেতনায় চিরভাসমান।
আসুন, আমরা এই মহিমান্বিত দিনের শিক্ষা ধারণ করি, অন্যায়-অত্যাচারের বিরুদ্ধে অবস্থান নেই এবং ন্যায় ও মানবতার পথে অবিচল থাকি। আল্লাহ আমাদের সবাইকে এই দিনের প্রকৃত তাৎপর্য অনুধাবন ও তাঁর নৈকট্য লাভের তৌফিক দান করুন।